• বুধবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৪, ০৩:৪০ পূর্বাহ্ন

কুমারখালীর বিখ্যাত কুলফি মালাই-স্বাদ ও মানে সেরা

মাহমুদ শরীফ / ৩৯ Time View
Update : বুধবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

প্রকৃতিতে শীত বা গরমের মাত্রা যেমনই থাকুক না কেন, কুষ্টিয়ার কুমারখালীর কুলফি মালাইয়ের শীতল পরম স্বাদ নিতে মানুষের ভিড় থাকে সব সময়। শহরের অলিগলি, দুইটি গড়াই সেতু, ষ্টেশন-বাসস্ট্যান্ড, গ্রামের হাটবাজার, লালনশাহের আঁখড়া বাড়ী কিংবা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে সারা বছর থাকে লালসালু মোড়ানো কুলফি মালাইয়ের হাঁড়িওয়ালাদের আনাগোনা। হাঁক ছাড়ছেন ‘এই যে কুলফি– কুলফি মালাই’! দারূণ স্বাদ- খেতে মজা— বলে।
তিলের খাজার পরে কুষ্টিয়ার ঐতিহ্য হিসেবে যুগ যুগ ধরে টিকে আছে এই কুলফি মালাই। কুমারখালী-যদুবয়রা সেতুতে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীরা কুলফির স্বাদ পেয়ে তুলছেন তৃপ্তির ঢেঁকুর। যারা তৈরি করছেন তারাও লাভের পাশাপাশি মানের ব্যাপারে বেশ সজাগ।

কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে পরিবার পরিজন নিয়ে বেড়াতে আসেন তাদের প্রথম পছন্দ কুলফি মালাই। অনেকেই দুর থেকে ছুটে আসেন অতুলনীয় স্বাদের এই মালাইয়ের টানেই। গরমের মাত্রা যতো বাড়ে ততই চাহিদা বাড়ে লালসালু মোড়ানো বড় পাত্রে বরফে ডুবিয়ে রাখা এই কুলফির। কুষ্টিয়ার পর্যটন কেন্দ্রগুলোর সামনে সারিবদ্ধভাবে বসে থাকেন মালাইওয়ালারা। এছাড়াও কুলফির পাত্র মাথায় করে সারা ঘুরতে দেখা যায় এদের। এই কুলফির স্বাদের যাদুতে মুগ্ধ সবাই।

বর্তমানে কুলফির পরিবেশনের ক্ষেত্রেও আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। এক সময় কলা গাছের পাতায় ক্রেতার হাতে কুলফি তুলে দেওয়া হত। নারকেল গাছের পাতা কেটে টুকরো করা চামুচে বা সরাসরি ক্রেতা মুখে পুরে নিতেন রসালো কুলফি। সেই পাতার ব্যবহার এখন আর নেই। ওয়ান টাইম চা-কফির প্লাস্টিকের কাপ আর ছোট্ট চামুচ ব্যবহার করা হচ্ছে। কাপ ব্যবহারে পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি সুবিধা হওয়ায় খুশি সবাই।

সুস্বাদু এই কুলফি মালাইয়ের ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায়, আশির দশকে উপজেলার উত্তর কয়া গ্রামের আব্দুল জলিল প্রথমে এই খাবারটি তৈরি করেন। তার মৃত্যুর পর ছেলে আব্দুস সলিম পিতার পেশা ধরে রেখেছেন। দিন দিন কুলফির চাহিদা বেড়েছে। বর্তমানে উত্তর কয়া, শ্রীকোল, বেড় কালোয়া, সুলতানপুর গ্রামের দুই শতাধিক মানুষ এই ব্যবসায় জড়িত।

মুখোরোচক কুলফি মালাই পেশার সাথে জড়িতরা এর তৈরি প্রনালী সম্পর্কে জানান, গরুর খাঁটি দুধ ৫/৬ ঘণ্টা জ্বালিয়ে ঘোনো করার পর তৈরি হয় সর। সেই সরের সঙ্গে চিনি, লবন, এলাচ মিশিয়ে তৈরি করা হয় কুলফি মালাইয়ের ঘোনো মূল পেস্ট। ঘোনো তরল মালাই বিভিন্ন আকারের টিনের কৌটায় ভরে গমের আটা দিয়ে মুখ আটকে পাত্রের মধ্যে বরফ ও লবনে ডুবিয়ে রাখা হয়। পাত্র নাড়াচাড়া দিলেই বরফে জমতে থাকে মালাই। বিভিন্ন আকারের বিখ্যাত এই কুলফি ৩০ টাকা থেকে শুরু করে ১০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয় প্রতিটি কৌটা। বিক্রেতারা বলছেন, প্রতিদিন দুই শতাধিক বিক্রেতা কুলফি বিক্রি করে থাকেন বিভিন্ন এলাকায়। তারা জানায়, লাভের চিন্তার পাশাপাশি মানের বিষয়টিও সব সময় ভাবেন কুলফিওয়ালারা।

সদ্য খুলে দেওয়া কুমারখালী-যদুবয়রা সেতুতে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা দর্শনার্থী আহসান হাবীব জানান, আমার পরিবার নিয়ে ঘুরতে এসেছি। এখানে এসে কুলফি মালাই খেলাম, সত্যিই অসাধারন স্বাদ। এমন মধুর কুলফি কখনও খাইনি, সবাই খেলাম এবং বাসার জন্যও নিয়ে যাচ্ছি।

 

গৃহবধূ সালমা বেগম জানান, শুধু মাত্র এই বিখ্যাত কুলফি খেতেই সন্তানদের সাথে এসেছি। এই কুলফি এতো মজার যে একটি খেলেই আরেকটি খেতে মন চায়, আর তাই মাঝে মাঝেই এখানে আসি শুধু কুলফি মালাই খেতে।

কুলফি বিক্রেতারা বলছেন, শুধু কুঠিবাড়ি এলাকাতেই মালাই বিক্রি করে ৩০টি পরিবারের সংসার চলে। আগে কুঠিবাড়ির ভিতরে বিক্রির সুযোগ থাকলেও এখন আমাদের কোন বসার স্থান নেই। কুমারখালী-যদুবয়রা সেতুতে ৬/৭ জন নিয়মিত কুলফির হকার। কুলফি বিক্রেতা বাবুল হোসেন, আগে নৌকার মাঝি ছিলেন। খেয়াঘাট বন্দ হওয়ায় সে এখন কুলফির হকার। বাবুল জানায়, বেশ ভালোই চলছে। বৃষ্টি হলে বেচাকেনা ভালো হয় না। প্রতিদিন ৩/৪ হাজার টাকায় বিক্রি করে বাবুল। এতে ৫/৬ শত টাকা লাভ হয়।
কুমারখালীর দুই শতাধিক পরিবার নিজ হাতে তৈরি এই কুলফি মালাই বিক্রি করে স্বচ্ছলতার মুখ দেখছে বাবুলের মত। স্বাদ ও মানে সেরা কুমারখালীর এই কুলফির জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে, যা অর্থনৈতিক ভাবে দেখাচ্ছে আশার আলো। অচিরেই হয় তো কুষ্টিয়ার বিখ্যাত তিলের খাজার মত ব্রান্ডিং হবে দুধ চিনি এলাচের কুলফি মালাই। আর সে দিন খুব বেশি দুরে নয়!


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও সংবাদ